প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কারণ বা পটভূমি আলোচনা করো।
![]() |
| চিত্র: প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কারণ, সারায়েভো হত্যাকাণ্ড, জোট ব্যবস্থা ও অস্ত্র প্রতিযোগিতা (Class 9 History Note) |
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ (১৯১৪-১৯১৮) কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না। এর পেছনে ইউরোপের শক্তিশালী দেশগুলোর মধ্যে দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামরিক দ্বন্দ্বের প্রভাব সক্রিয় ছিল। নিচে এগুলিকে দুটি ভাগে ভাগ করে আলোচনা করা হলো।
📌 (ক) দীর্ঘমেয়াদি কারণ বা পটভূমি :
১. চরম জাতীয়তাবাদ :
- প্যান-আন্দোলন : এই সময়ে স্লাভ, জার্মান প্রভৃতি জাতিগোষ্ঠী নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণে মরিয়া হয়ে ওঠে। প্যান-স্লাভবাদ (সমস্ত স্লাভদের এক হওয়া) ও প্যান-জার্মানবাদের প্রসার ইউরোপকে অস্থির করে তোলে।
- ফ্রান্সের প্রতিশোধস্পৃহা : ১৮৭১ সালে জার্মানির কাছে ফ্রান্সের আলসাস-লোরেন অঞ্চল হারানোর প্রতিশোধ নেওয়ার আকাঙ্ক্ষা প্রকট ছিল।
২. সাম্রাজ্যবাদী প্রতিযোগিতা :
- কাঁচামাল ও বাজার দখল : ইউরোপের শিল্পবিপ্লবের পর কাঁচামাল ও বাজারের প্রয়োজনে দেশগুলো আফ্রিকা, এশিয়া আগ্রাসী উপনিবেশ স্থাপনে প্রতিযোগিতায় নামে।
- ব্রিটেন ও ফ্রান্সের একাধিপত্য : এই প্রতিযোগিতায় ব্রিটেন ও ফ্রান্সের একাধিপত্যকে জার্মানি ও ইতালি চ্যালেঞ্জ জানালে সংঘাত অনিবার্য হয়ে ওঠে।
৩. সামরিকবাদ ও অস্ত্র প্রতিযোগিতা :
- বাধ্যতামূলক সেনা নিয়োগ : ‘সামরিক শক্তিই জাতির মেরুদণ্ড’— এই নীতিতে বিশ্বাসী হয়ে প্রতিটি দেশ বাধ্যতামূলক সেনা নিয়োগ এবং নৌ-সেনা বৃদ্ধি করতে থাকে।
- নৌ-শক্তি বৃদ্ধির প্রতিযোগিতা : বিশেষ করে ব্রিটেন ও জার্মানির মধ্যে ভয়াবহ নৌ-শক্তি বৃদ্ধির প্রতিযোগিতা শুরু হয় (ড্রেডনট যুদ্ধজাহাজ নির্মাণ)।
৪. পরস্পরবিরোধী জোট ব্যবস্থা :
· ইউরোপ তখন দুটি শক্তিশালী সামরিক জোটে বিভক্ত ছিল:
- ত্রিশক্তি আঁতাত (Triple Entente): ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও রাশিয়া।
- ত্রিশক্তি মৈত্রী (Triple Alliance): জার্মানি, অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি ও ইতালি।
· এই জোট ব্যবস্থার ফলে দুটি দেশের মধ্যে স্থানীয় বিবাদ সহজেই বৃহত্তর যুদ্ধের রূপ নেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
৫. বলকান অঞ্চলের সংকট
- বলকান জাতীয়তাবাদ : ইউরোপের বলকান অঞ্চল ছিল বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী ও ধর্মের মিশ্রণস্থল, যা তখন উসমানীয় তুরস্কের দুর্বলতার সুযোগে ‘ইউরোপের বারুদের স্তূপ’-এ পরিণত হয়।
- অস্ট্রিয়া ও রাশিয়ার দ্বন্দ : অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি এই অঞ্চল দখল করতে চাইছিল, অন্যদিকে রাশিয়া স্লাভ জাতিদের পৃষ্ঠপোষকতা করছিল।
📌 (খ) প্রত্যক্ষ (তাৎক্ষণিক) কারণ :
সারায়েভোর হত্যাকাণ্ড ও জুলাই সংকট
- হত্যার ঘটনা: ১৯১৪ সালের ২৮ জুন, অস্ট্রিয়ার যুবরাজ আর্চডিউক ফ্রাঞ্জ ফার্দিনান্দ বসনিয়ার রাজধানী সারায়েভোতে এক সার্ব জাতীয়তাবাদী ছাত্রের গুলিতে নিহত হন।
- চরমপত্র: এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধে অস্ট্রিয়া জার্মানির সমর্থনে সার্বিয়াকে এমন কঠোর শর্ত দেয় (আলটিমেটাম), যা কোনো স্বাধীন দেশের পক্ষে মানা সম্ভব ছিল না।
- শৃঙ্খল প্রতিক্রিয়া: সার্বিয়ার অস্বীকৃতির পর অস্ট্রিয়া তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলে রাশিয়া সার্বিয়ার পক্ষে সেনা সমাবেশ করে। ফলে জার্মানি রাশিয়া ও ফ্রান্সের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে এবং বেলজিয়াম আক্রমণ করলে ইংল্যান্ডও যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে।
উপসংহার:
সুতরাং, সারায়েভোর হত্যাকাণ্ড ছিল কেবল আগুনের ফুলকি, যা দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা উত্তেজনার বারুদে আগুন লাগিয়ে বিশ্বযুদ্ধের সূচনা করে।
----------xx-----------
📍 পঞ্চম অধ্যায়ের সমস্ত বড় প্রশ্নের (৮ নম্বর) উত্তর একসাথে পেতে 👉এখানে ক্লিক করো
📌 এই প্রশ্নটি অন্য যেভাবে আসতে পারে :
- প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কারণ কী ছিল?
- ১৯১৪ সালে কেন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়?
- কোন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়?
- প্রথম বিশ্বযুদ্ধ যুদ্ধের পটভূমি বিশ্লেষণ করো।
📌 প্রথম বিশ্বযুদ্ধ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ আরও কিছু প্রশ্ন :
- প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ফলাফল বা প্রভাব আলোচনা করো।
- চোদ্দো দফা নীতি কী? কে কোন প্রেক্ষাপটে এই নীতি ঘোষণা করা হয়?
- ভার্সাই চুক্তি কী? এই চুক্তির মূল শর্ত কী ছিল? ভার্সাই চুক্তির মূল উদ্দেশ্য কী ছিল?
- জাতিসংঘ কী? কার উদ্দোগে কেন জাতিসংঘ গড়ে ওঠে?
- ১৯২৯ সালের মহামন্দা বলতে কী বোঝো? মহামন্দার কারণ কী ছিল?
- সমকালীন ইউরোপ ও আমেরিকায় মহামন্দার কী প্রভাব পড়েছিল?

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন