১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লবের জন্য রাজনৈতিক,অর্থনৈতিক এবং সামাজিক কারন গুলি আলোচনা কর।
অথবা,
ফরাসি বিপ্লবের কারনগুলি আলোচনা কর।
ফরাসি বিপ্লব ঃ
১৭৮৯ সালে ফরাসি বিপ্লব শুধু ফ্রান্সের ইতিহাসে নয়, গোটা বিশ্বের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী ঘটনা।এই বিপ্লব হওয়ার পিছনে ছিল দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত নানা অভাব অভিযোগ। ঐতিহাসিক লেফেভরের-এর মতে ফরাসি বিপ্লবের উৎস অনুসন্ধান করতে হবে তার অতীত ইতিহাসের মধ্যে।
ফরাসি বিপ্লবের কারন
ফরাসি বিপ্লবের পিছনে প্রকৃতপক্ষে তিনটি কারণ দায়ী ছিল-
১) রাজনৈতিক কারন
২) সামাজিক কারণ
৩) অর্থনৈতিক কারণ
ফরাসি বিপ্লবের রাজনৈতিক কারন
ফরাসি বিপ্লব ছিল প্রকৃতপক্ষে দীর্ঘদিন ধরে বুঁরবো রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে জমে থাকা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ।রাজারা ঈশ্বরপ্রদত্ত ক্ষমতায় বিশ্বাসী ছিলেন এবং তারা বংশানুক্রমিকভাবে শাসনকার্য পরিচালনা করতেন। রাজাদের দুইরকম ভাবে শাসনকার্য চালাত--
ক) রাজাদের দুর্বল শাসন : ফরাসি রাজা চতুর্দশ লুই(১৬৪৩-১৭১৫ খ্রীঃ) বিলাস ব্যসনে মগ্ন থেকে স্বৈরাচারী ক্ষমতার মাধ্যমে শাসনকার্য পরিচালনা করতেন।তিনি বলতেন “আমিই রাট্র”। পরবর্তী রাজা পঞ্চদশ লুই(১৭১৫-১৭৭৪ খ্রীঃ) ছিলেন বিলাসী,অলস ও পরিশ্রমবিমুখ পরবর্তী ফরাসি রাজ দুর্বল চিত্ত ষোড়শ লুই(১৭৭৪-১৭৯৩ খ্রীঃ) এর আমলে রাজতন্ত্র অবক্ষয়ের শেষ সীমায় পৌছায়।তার পক্ষে রাজশক্তির পতন রোধ করা সম্ভব হয়নি।
খ) দুর্নীতিগ্রস্ত প্রশাসন: রাজ শক্তির এই দূর্বলতার সুযোগে শাসন কার্য সম্পন্নভাবে অভিজাতদের হাতে চলে যায়।শাসন ব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে স্বৈরাচারী ও দুর্নীতি গ্রস্থ হয়ে পড়ে এবং তা ইনটেন্ডেন্ট নামক কর্মচারীদের হাতে চলে যায়। তারা নিজ স্বার্থ সিদ্ধির জন্য চরম অত্যাচারী হয়ে ওঠে এবং জনসাধারণ তাদের অর্থলোলুপ নেকড়ে উপাধিতে ভূষিত করে।লেতর দ্য ক্যাশে নামক গ্রেফতারি পরোয়ানার সাহায়্যে তারা যেকোন সাধারণ মানুষকে বিনা বিচারে বন্দি করে রাখতে পারতো।এর ফলে বাস্তিল দুর্গ নিরপরাধ বন্দিতে পূর্ণ হয়ে যায়।দার্শনিক ভলতেয়ার এই সীমাহীন রাজনৈতিক সংকটের কারণে ফ্রান্সকে ‘রাজনৈতিক কারাগার’ বলে অভিহিত করেছেন।
ফরাসি বিপ্লবের সামাজিক কারণ:
ফরাসি বিপ্লবের অন্যতম কারণ হলো শ্রেণীবিভক্ত সমাজ ব্যবস্থা,সমগ্র ফরাসি সমাজ তিনটি প্রধান শ্রেণীতে বিভক্ত ছিল যথা যাজক,অভিজাত ও সাধারণ মানুষ।
ক) যাজক বা প্রথম শ্রেণীঃ ফরাসি সমাজ ব্যবস্থায় যাজকরা ছিল প্রথম শ্রেণি। এরা ছিল বিশেষ সুবিধাভোগী এবং ফ্রান্সের মোট জনসংখ্যার ১% যা ছিল ১ লক্ষ ২০ হাজার। এরা বিভিন্ন রকম কর আদায় করলেও নিজে কোন কর দিতনা রাষ্ট্রের সব রকম সুযোগ-সুবিধা এরা ভোগ করত।
খ) দ্বিতীয় শ্রেণীর : ফরাসি সমাজে অভিযাতরা ছিলেন দ্বিতীয় শ্রেণী ভুক্ত।এরা ছিল ফ্রান্সের মোট জনসংখ্যার ১.৫ শতাংশ যা ছিল ৩ লক্ষ ৫০ হাজার।ফ্রান্সের মোট জমির ২০ শতাংশ ছিল এদের দখলে।এরা জমির জন্য সরকারকে কোন প্রত্যক্ষ কর দিতনা আবার সরকারের বিভিন্ন উচ্চপদগুলি এরাই ভোগ করত।
গ) তৃতীয় শ্রেণি: ফরাসি সমাজের ব্যবসায়ী,কৃষক,শ্রমিক,বুদ্ধিজিবী,সর্বহারা সকলেই ছিলেন তৃতীয় শ্রেনীভুক্ত। মোট জনসংখ্যার এরা ছিল ৯৬-৯৭ শতাংশ।এরা ছিল অসাম্যের শিকার,সমাজে এদের কোন মর্যদা ছিলনা,সমস্ত রকমের কর এই তৃতীয় শ্রেনীকে দিতে হত।এরা নানা রকম শোষন সহ্য না করতে পেরে শেষ পর্যন্ত বিপ্লবের পথ বেছে নিয়েছিল।
ফরাসি বিপ্লবের অর্থনৈতিক কারণ :
শূন্য রাজকোষ ও ফ্রান্সের আর্থিক দুরবস্থা বিপ্লবের জন্য বহুলাংশে দায়ী ছিল।
ক) বৈষম্যমূলক কর ব্যবস্থাঃ ফ্রান্সের প্রথম দুই শ্রেণী অর্থাৎ যাজক ও অভিযাজরা বেশিরভাগ ভূ সম্পত্তি ভোগ করলেও তাদের কর দিতে হতো না কিন্তু অপরপক্ষে সরকারের মোট রাজত্বের ৯৬ শতাংশ দিতে হত তৃতীয় সম্প্রদায়কে। বিভিন্ন ধরনের কর প্রদানের পর তাদের হাতে মাত্র ২০শতাংশ অর্থাৎ পাঁচ ভাগের এক ভাগ বাঁচত।এই অত্যাধিক করের বোঝা তৃতীয় সম্প্রদায়কে বিদ্রোহী করে তুলেছিল।
খ) এছাড়াও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি,রাজার আরো কর আরোপের চেষ্টা এবং সর্বোপরি ব্যয়বহুল যুদ্ধ ফ্রান্সকে অর্থনৈতিক দিক থেকে শেষ করে দিয়েছিল।যার ফলে সাধারণ মানুষের শেষ পর্যন্ত বিদ্রোহের পথ বেছে নিয়েছিল।
উপসংহার: পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে, ১৭৮৯ সালে ফ্রান্সে যে বিপ্লব হয়েছিল তা ছিল মুলত দীর্ঘদিনের সামাজিক,অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে অত্যাচারিত তৃতীয় সম্প্রদায়ের এক বলিষ্ঠ প্রতিবাদ।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন